লেখা তরজমা

ভালোবাসার নজরুল

যখন কোনো স্যাড স্টোরি শুনি স্বভাবতই সেই স্টোরির নায়ক কিংবা নায়িকার উপর এক ধরণের সিমপ্যাথী জন্ম নেয়। কাজী নজরুলের প্রতি ভালোবাসা ঠিক এরকম একটি পরিস্থিতির শিকার আমার কাছে। দুঃখু মিয়ার দুঃখের কাহিনী পড়ে যে সিমপ্যাথী জন্ম নিয়েছিলো তা আজ ভালোবাসায় রূপান্তর হয়েছে।

যখন একেবারেই ছোট ছিলাম "প্রভাতী ",  "লিচুচোর", "খুঁকি ও কাঁঠবেড়ালী"  কবিতাগুলো পড়ে কাজীর প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলাম। "সংকল্প" কবিতার মাধ্যমে পেয়েছিলাম একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখবার পথ। খাতার পেছনে লেখা "চল চল চল" সবসময়ই পড়তাম। কাজী নজরুলের কবিতা পড়ার অনুভূতিই ছিলো অন্যরকম।

"মানুষ", "পাপ", "সাম্যবাদী ", "নারী", "বারাঙ্গনা " কবিতা গুলো পড়লেই এক অন্যরকম সমাজের চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠে।সমাজের অসংগতি গুলো কি সুন্দর ভাবেই না তুলে ধরেছেন। "কান্ডারী হুশিয়ার" কবিতায় কবির নিরপেক্ষতার পরিচয় কি নিপুণ ভাবে ফুটে উঠেছে, সমগ্র মানবতার জন্যই কবির চিন্তা বিস্তৃত। "কুলি-মজুর" কবিতায় মানুষের অধিকার নিয়ে কবি কলম চালিয়েছেন। "সব্যসাচী " কবিতায় কবি লিখেছেন এমন কিছু লোকের কথা যারা সমাজের ভালোর জন্য সবকিছুই করতে প্রস্তুত। মানুষের কাছে তার কর্ম, তার সৃষ্টির থেকে প্রিয় কিছুই নেই। সৃষ্টির আনন্দে মানুষ আত্নহারা হয়ে যায়। "আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে " কবিতায় সৃষ্টির আনন্দের স্বরূপ আমরা বুঝতে পারি। "আনন্দময়ীর আগমনে" পড়ে বুঝেছি কবিতার আঘাত ঠিক কতটা কঠিন।


ইসলামের ইতিহাস ভিত্তিক "খালিদ বিন ওয়ালিদ", "ওমর ফারুক" কবিতাগুলো একেকটি অমুল্য সৃষ্টি। এই কবিতাগুলো পড়বার সময় এক অন্যরকমের ভালোলাগা কাজ করে। তৎকালীন বিখ্যাত ব্যক্তি যেমন, মুস্তফা পাশা, জগলুল পাশা সহ প্রমুখ ব্যক্তিদের নিয়ে লিখেছেন স্বরণীয় কবিতা। কবির অন্যতম বিখ্যাত সৃষ্টি “কাব্য আমপারা।” এই কাব্য আমপারায় কবি ভাবের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না করেই ভাষার অর্থবহ ও সামঞ্জস্যশীল ব্যবহারের মাধ্যমে এক অনবদ্য অনুবাদ করেছেন কবিতার সাহায্যে, ছন্দের মারপ্যাঁচে। কবি রাসূল(সাঃ) এর জীবনি লিখতে শুরু করেছিলেন "মরু ভাস্কর" নামে, শেষ করে যেতে পারেননি। এটাও রচিত হচ্ছিলো ছন্দের কারুকাজে। বিদ্রোহী কবির বিখ্যাত "বিদ্রোহী " কবিতা সম্পর্কে কিছুই বলার নেই। কবির রচিত সাহিত্যের গভিরতা বুঝার জন্য এটিই যথেষ্ট।

সাম্যের কবি, দ্রোহের কবি নামে কবির পরিচিতি ব্যাপক হলেও তার সাহিত্যের একটি অংশ জুড়ে রয়েছে প্রেমের উপাখ্যান। কবির রচিত ১৮টি গল্পের মাঝে ১৬টিই যে প্রেমের! কবির ১৮ টি গল্প মোট ৩টি গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে।

কবির প্রবন্ধ সংকলনও রয়েছে। এছাড়া কাব্যনুবাদ ৩টি, ছোটদের কাব্যগ্রন্থ ২টি এবং মোট কাব্যগ্রন্থ ২৩টি। কবির ৩টি উপন্যাসও রয়েছে।
" বাঁধনহারা,  মৃত্যুক্ষুধা ও কুহেলিকা " কবির তিনটি উপন্যাস।


"বাঁধনহারা " উপন্যাসটি হচ্ছে পত্রোপন্যাস। অর্থাৎ পুরো উপন্যাসটি পত্রের আলোকে লেখা হয়েছে। অসাধারণ একটি রচনা। এটিতে যে বিদ্রোহীতার আভাস পাওয়া যায় সেটিই বিদ্রোহী কবিতায় পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে।


"মৃত্যুক্ষুধা" উপন্যাসটি কবির সমসাময়িক প্রেক্ষাপট নিয়েই রচিত। সাধারণ গ্রাম্য পরিবেশে খৃস্টান মিশনারিদের দাপট,  গ্রামের হাবাগোবা মানুষের অন্ধ বিশ্বাস, টাকার অভাবে বিশ্বাসে অভাব এরকম কিছু প্রেক্ষাপটেই রচিত এটি।
"কুহেলিকা " উপন্যাসে কবির জীবন সম্পর্কে এক সুন্দর বিশ্লেষণ প্রকাশ পায়। মূলত বিপ্লবীদের নিয়ে লিখিত একটি উপন্যাস।

কাজী নজরুলের রচিত সঙ্গীত গুলোর কথাও আলাদা ভাবে বলতে হয়। "রমযানের ঐ রোযার শেষে", "জাগিলে 'পারুল' কি গো ' সাত ভাই চম্পা ' ডাকে", "বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল" ইত্যাদি সহ আরো কিছু মাষ্টারক্লাস সঙ্গীত তার কলমের খোঁচায়ই রচিত হয়েছে। বাংলা গজলের প্রতিষ্ঠাতা তো তিনিই। “ হে নামাজী, আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ” সঙ্গীতটার কথা আলাদা ভাবেই বলতে হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম, দ্রোহের কবি, সাম্যের কবি, মানবতার কবি, আমাদের জাতীয় কবি। কাজী নজরুলের সঠিক মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন তার রচিত সাহিত্যের যথাযথ মূল্যায়ন।  একজন মানুষকে তার কর্মের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমেই আমরা সম্মান জানাতে পারি। নজরুলের সাহিত্য চর্চা শুধু দিবস কেন্দ্রিক নয়, বছরের ৩৬৫ দিনই বজায় থাকুক।

#ভালোবাসার_নজরুল

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ